এই লেখায়
  1. প্যারিসে দুই সংগীতশিল্পীর পরিচয়
  2. খাবার টেবিলে গিটার কনচের্তোর অনুরোধ
  3. পিয়ানো বিক্রির বছর
  4. ব্রেইল থেকে শিল্পীর স্বরলিপি
  5. ইংলিশ হর্ন থেকে গিটারে সুর
  6. বার্সেলোনায় প্রথম পরিবেশনা ও মাহিনার তালিকা
  7. মাহিনায় যে সংগীত শুনবেন

সংক্ষিপ্ত উত্তর

1939 সালে প্যারিসে হাসপাতালের খরচের জন্য হোয়াকিন রোদ্রিগো ও ভিক্টোরিয়া কামহি পিয়ানো বিক্রি করেন। একই বছর রোদ্রিগো Concierto de Aranjuez সম্পূর্ণ করেন। গিটার ও অর্কেস্ট্রার বাজানোর স্বরলিপি প্রস্তুত করতে তাঁরা ব্রেইলে লেখা, মুখে বলা স্বর লিখে নেওয়া ও একসঙ্গে সংশোধনের কাজ করেন।

বিস্তারিত পাঠ

প্যারিসে দুই সংগীতশিল্পীর পরিচয়

স্পেনের সাগুনতোয় রোদ্রিগোর জন্ম। ছোটবেলায় ডিফথেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় দৃষ্টিহীন হন; ভালেনসিয়ায় সংগীত শেখেন। গিটার কনচের্তোর জন্য পরিচিত হলেও তিনি পিয়ানোবাদকও ছিলেন। 1927 সালে প্যারিসে গিয়ে পল দুকার কাছে সুররচনা শেখেন। সংগীত লেখা ও বই পড়ার জন্য অন্যের সাহায্য দরকার হত। সচিব ও অনুলিপিকার রাফায়েল ইবানিয়েস সাহিত্য ও দর্শন পড়ে শোনাতেন; নিজের চোখের কাজ করা মানুষ হিসেবে তাঁকে স্মরণ করেন রোদ্রিগো।

ইস্তানবুলের ধনী পরিবারে বড় হন ভিক্টোরিয়া। পরিবার দেউলিয়া হলে জীবন বদলে যায়। পিয়ানো শিক্ষকের সাহায্যে পড়াশোনা চালান এবং প্যারিসে সংগীতশিক্ষকের যোগ্যতা পান। দুই শিল্পীর পরিচয় হয় 1928 সালে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও অনিশ্চিত আয়ের শিল্পীর সঙ্গে মেয়ের বিয়েতে ভিক্টোরিয়ার বাবা আপত্তি করেন। পরিবারের বিরোধিতা ও একবার বিচ্ছেদের পরে 1933 সালে ভালেনসিয়ায় তাঁরা বিয়ে করেন। পরেও খরচের অভাবে আলাদা থাকতে হয়।

বিয়ের পরে পিয়ানোবাদক হিসেবে নিজের কাজ বন্ধ করে স্বামীর কাজে অংশ নেন ভিক্টোরিয়া। স্প্যানিশ, ফরাসি ও জার্মান জানতেন; গানের কথা অনুবাদ ও মঞ্চের রচনার পাঠ লিখতেন। Pavana real ও Juana y los caldereros ব্যালে এবং গীতল কমেডি El hijo fingido-তে তাঁর লেখা ব্যবহার হয়। ডেড সি স্ক্রোলের পাঠ গান করার জন্য কবিতায়ও সাজান। সের্ভান্তেস ও উনামুনোর লেখায় রোদ্রিগোর দেওয়া সংগীতের কথাগুলি জার্মান ও ফরাসিতে অনুবাদও করেন। স্বর ও গানের কথা, দুই বিষয়েই দম্পতি কাজ করেন।

খাবার টেবিলে গিটার কনচের্তোর অনুরোধ

1938 সালের সেপ্টেম্বরে সান সেবাস্তিয়ানের খাবার টেবিলে Concierto de Aranjuez-এর অনুরোধ আসে। রোদ্রিগোর লেখায়, ফ্রান্সে ফিরে যাওয়ার আগে গিটারবাদক রেহিনো সাইন্‌স দে লা মাসা তাঁকে গিটার ও অর্কেস্ট্রার কনচের্তো লিখতে বলেন। দীর্ঘদিনের ইচ্ছা বলে তাঁকে বোঝান; রিওহা ওয়াইন খাওয়ার পরে রোদ্রিগো লেখার সম্মতি দেন। স্পেনের গৃহযুদ্ধ তখন চলছিল। অনিশ্চিত সময়ের আনন্দময় স্মৃতি হিসেবে খাবারের এই অভিজ্ঞতা লিখে রাখেন।

আরানহুয়েসের দ্বিতীয় ইসাবেলের বাগান। 2014 সালে তোলা ছবি।
আরানহুয়েসের দ্বিতীয় ইসাবেলের বাগান। 2014 সালে তোলা ছবি।

সুরকারের বর্ণনায় লেখার ক্রমও আকর্ষণীয়। অনুরোধের প্রায় দুই মাস পরে প্যারিসের রু সাঁ জাকের ছোট কাজের ঘরে Adagio-র সুর একবারে মনে এসেছিল বলে লেখেন। শিগগিরই শেষ পর্বের মূল সুরও আসে। প্রথম পর্ব হিসাব ও চিন্তা করে সম্পূর্ণ করেন বলে জানান। পরিবেশনায় প্রথমে শোনা পর্বটি লেখেন সবশেষে। 1939 সালে প্যারিসে রচনা সম্পূর্ণ হয়; স্পেনে ফেরার সময় দম্পতির মালপত্রে ব্রেইলের কনচের্তোর পাণ্ডুলিপি ছিল।

মাদ্রিদের দক্ষিণে আরানহুয়েস পুরোনো রাজকীয় গ্রীষ্মপ্রাসাদ ও বাগানের জন্য পরিচিত। বিয়ের প্রথম দিকে রোদ্রিগো ও ভিক্টোরিয়া সেখানে একসঙ্গে হাঁটেন। পরে Adagio ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সেই হাঁটা ও আনন্দের নবদাম্পত্যের স্মৃতি মনে করেন ভিক্টোরিয়া। স্মৃতিকথায় সংগীতটিকে প্রেমের গানও বলেছেন। তাঁদের হাঁটার স্থানের নামে লেখা রচনা বহু পরে দুজনের জীবন নিয়ে বইয়ে আবার আলোচনা করেন তিনি।

পিয়ানো বিক্রির বছর

স্পেনের গৃহযুদ্ধ শুরু হলে তাঁদের অবস্থা আরও কঠিন হয়। প্যারিসে রোদ্রিগোর পড়াশোনার বৃত্তি বন্ধ হয়। জার্মানির ফ্রাইবুর্গে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের আশ্রয়স্থলে স্পেনের শরণার্থী হিসেবে থাকেন; নিজের ঘরে স্প্যানিশ ও সংগীত শেখান। সেখানে ব্ল্যাক ফরেস্টের পাখির শব্দ অধ্যয়ন করেন রোদ্রিগো এবং ‘কোকিলের গান’ও লেখেন। স্থায়ীভাবে থাকা কঠিন এই সময়েও আশপাশের ধ্বনি শোনা এবং গানের কথায় সুর দেওয়ার কাজ চালান।

1939 সালে গর্ভাবস্থায় সন্তান হারিয়ে ভিক্টোরিয়া নিজেও সংকটজনক অসুস্থ হন। চিকিৎসার টাকা দিতে প্রিয় প্লেয়েল পিয়ানো বিক্রি করেন দম্পতি। তাঁর স্মৃতিকথায় বাড়িওয়ালি আমালিয়া কারাসকোর স্মৃতিও আছে: স্ত্রী হাসপাতালে থাকার সময় রাতে পিয়ানোয় রোদ্রিগো বিষণ্ণ সুর তৈরি করতেন। প্লেয়েল পিয়ানোটি ভিক্টোরিয়া বাবা-মায়ের কাছ থেকে উপহার পেয়েছিলেন। সেটি বিক্রির নথি দম্পতির সেই সময়ের অর্থকষ্ট স্পষ্টভাবে জানায়।

ব্রেইল থেকে শিল্পীর স্বরলিপি

ব্রেইলের স্বরলিপিতে রচনা লিখতেন রোদ্রিগো। শিল্পীকে দিতে হলে প্রচলিত স্বরলিপিতে রূপান্তর দরকার হত। পেশাদার অনুলিপিকারকে প্রতিটি যন্ত্রের স্বর একে একে বলতেন। উচ্চতা, দৈর্ঘ্য, শার্প ও ফ্ল্যাটের মতো বিস্তারিত চিহ্নও জানাতেন। অনুলিপিকার পাঁচ রেখায় লিখতেন; ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে রোদ্রিগো শেষ সংশোধন করতেন। কনচের্তোর বিভিন্ন যন্ত্রের অংশ প্রস্তুত করতে একই সংগীত ব্রেইল, মৌখিক বর্ণনা ও পাঁচ রেখার স্বরলিপিতে বারবার যাচাই করার সময় লাগত।

পাঁচ রেখায় লেখা C মেজর স্কেল এবং একই স্কেলের ব্রেইল স্বরলিপি।
পাঁচ রেখায় লেখা C মেজর স্কেল এবং একই স্কেলের ব্রেইল স্বরলিপি।

এই হাতে লেখা স্বরলিপির একটি কপি সাইন্‌স দে লা মাসা পেয়ে প্রথম পরিবেশনা প্রস্তুত করেন। সুরকারের ব্রেইল স্বরলিপিও এখনও সংরক্ষিত আছে। ব্রেইল পাণ্ডুলিপির পাশে ছিল রাফায়েল ইবানিয়েস, পেশাদার অনুলিপিকার ও ভিক্টোরিয়ার লিখে নেওয়া স্বরলিপি। মুখে বলার সময় যন্ত্র অনুযায়ী অংশ ব্যাখ্যা করতেন; শেষ সংশোধন ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে করতেন। মনে গড়ে তোলা গিটার ও অর্কেস্ট্রার সংগীত বাস্তব শিল্পীর পড়ার উপযোগী করতে কয়েকজন স্বর ও চিহ্ন লিখে আবার পরীক্ষা করেন।

ইংলিশ হর্ন থেকে গিটারে সুর

Adagio-র প্রথম সুর গিটার নয়, ইংলিশ হর্ন বাজায়। গিটার কর্ডের তার টেনে সঙ্গত করে, পরে একই বাক্যাংশ অলংকারসহ গ্রহণ করে। ইংলিশ হর্ন ও গিটার মূল সুর ভাগ করে বাজায়; পরে গিটার পুরো মূল সুর একা বাজায়। পরের ক্যাডেন্‌ৎসায় অর্কেস্ট্রার সঙ্গত ছাড়া এককশিল্পী দীর্ঘ বাক্যাংশ বাজান। তার পরে অর্কেস্ট্রা জোরে মূল সুর বাজায়। এককশিল্পীর মৃদু ধ্বনির কথোপকথন বিভিন্ন যন্ত্রের সম্মিলিত বাদনে বড় হওয়ার ক্রম এটি।

1912 সালে মানুয়েল রামিরেসের কর্মশালায় তৈরি গিটার। আন্দ্রেস সেগোভিয়া ব্যবহার করেছিলেন।
1912 সালে মানুয়েল রামিরেসের কর্মশালায় তৈরি গিটার। আন্দ্রেস সেগোভিয়া ব্যবহার করেছিলেন।
1807 সালের আগে গ্রেনসারের তৈরি ইংলিশ হর্ন।
1807 সালের আগে গ্রেনসারের তৈরি ইংলিশ হর্ন।

সুরের বাঁক আন্দালুসিয়ার গভীর গান cante jondo-র সঙ্গেও যুক্ত করে শোনা যায়। প্রথম ও শেষ পর্বে ছয় মাত্রাকে তিনটি করে দুই দলে অথবা দুটি করে তিন দলে গোনা হয়। গিটারের তারে আঘাত করে উপস্থাপিত ছন্দ অর্কেস্ট্রা গ্রহণ করে বাজায়। মাঝের দীর্ঘ সুর ও দুই পাশের নাচের ছন্দ একসঙ্গে শুনলে কনচের্তোর গঠন পরিষ্কার হয়। Adagio শেষে ছোট মেজর সমাপ্তি ও গিটারের ট্রিল আছে।

বার্সেলোনায় প্রথম পরিবেশনা ও মাহিনার তালিকা

1940 সালের 9 নভেম্বর বার্সেলোনার পালাউ দে লা মিউজিকা কাতালানায় কনচের্তো প্রথম বাজানো হয়। গিটার বাজান সাইন্‌স দে লা মাসা; বার্সেলোনা ফিলহারমনিক পরিচালনা করেন সেসার মেনদোসা লাসায়ে। প্যারিসে ব্রেইলে লেখা সংগীত সেদিন এককশিল্পী ও অর্কেস্ট্রা একসঙ্গে বাজান। ভিক্টোরিয়া সুস্থ হন এবং পরের বছর মেয়ে সেসিলিয়ার জন্ম দেন। পিয়ানো বিক্রির পরেও সুররচনা ও অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চালানোর নথি এই কনচের্তো সম্পূর্ণ ও প্রথম পরিবেশিত হওয়ার জীবনযাত্রা বিস্তারিত জানায়।

মাহিনার দুপুরের তালিকায় Adagio পাওয়া যায় James Galway Plays Rodrigo অ্যালবামে। এতে বাঁশিবাদক গলওয়ে ও গিটারবাদক কাজুহিতো ইয়ামাশিতা অংশ নেন। Concierto de Aranjuez ইয়ামাশিতা জাঁ ফ্রঁসোয়া পাইয়ার চেম্বার অর্কেস্ট্রার সঙ্গে রেকর্ড করেন। গিটারের জন্য লেখা Fantasía para un gentilhombre গলওয়ে বাঁশির জন্য সাজিয়ে বাজান। রোদ্রিগোর সংগীত দুজন আলাদাভাবে গিটার ও বাঁশিতে শোনান। গলওয়ের বাজানো Concierto pastoral-ও অ্যালবামে আছে।

দুপুর ও রাত, দুই তালিকার নারসিসো ইয়েপেসও রচনার প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান করেন। 1950 সালে প্যারিসের শঁজেলিজে থিয়েটারে আতাউলফো আরহেন্তার পরিচালনায় স্পেনের জাতীয় অর্কেস্ট্রার সঙ্গে বাজান। বার্সেলোনার প্রথম পরিবেশনার দশ বছর পরের ঘটনা। পরে মেয়ে সেসিলিয়া প্রকাশনা সংস্থা ও বাবা-মায়ের দুই নামের ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। ফাউন্ডেশন সুরকারের পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ করে। ভিক্টোরিয়া ও হোয়াকিনের একসঙ্গে প্রস্তুত স্বরলিপি পরবর্তী শিল্পীদের কাছে পৌঁছানোর কাজ পরিবারের পরের প্রজন্ম চালিয়ে যায়।

মাহিনায় যে সংগীত শুনবেন

মাহিনার দুপুর ও রাতের সংগীতে নারসিসো ইয়েপেসের বাজানো Concierto de Aranjuez-এর নির্বাচিত অংশ আছে। গিটারের সুর শুনলে ব্রেইল থেকে স্বর লিখে নেওয়া ও একসঙ্গে সংশোধন করা রোদ্রিগো ও ভিক্টোরিয়ার নাম পাশাপাশি মনে রাখবেন।